
ফেরদৌস ইসলাম: দেশজুড়ে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের অব্যাহত মূল্যবৃদ্ধি শিক্ষার্থীদের জীবনযাত্রায় মারাত্মক প্রভাব ফেলছে। চাল, ডাল, ভোজ্যতেল, ডিম, সবজি ও মসলাজাতীয় পণ্যের দাম বেড়ে যাওয়ায় সীমিত আয়ের পরিবারের শিক্ষার্থীরা পড়েছে চরম সংকটে। বিশেষ করে যারা মেসে থেকে পড়াশোনা করে বা টিউশনি ও পরিবারের সহায়তার ওপর নির্ভরশীল, তাদের জন্য দৈনন্দিন ব্যয় নির্বাহ দিন দিন কঠিন হয়ে উঠছে।
সরেজমিনে বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের আশপাশের মেস ও বাজার ঘুরে দেখা গেছে, আগের তুলনায় বাজার খরচ উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। মেসে থাকা শিক্ষার্থীরা জানান, মাসের শুরুতে বাজেট ঠিক করলেও মাঝামাঝিতেই অর্থ সংকট দেখা দেয়। ফলে নিয়মিত মাছ, মাংস, ডিম বা দুধের মতো পুষ্টিকর খাবার বাদ দিয়ে কম খরচের খাবারের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে। এতে একদিকে শারীরিক দুর্বলতা বাড়ছে, অন্যদিকে পড়াশোনায় মনোযোগ ধরে রাখা কঠিন হয়ে পড়ছে।
বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থী রবিউল বলেন, “আগে মাসে যে টাকায় বাজার করতাম, এখন একই পরিমাণ জিনিস কিনতে আরও বেশি টাকা লাগে। খরচ মেটাতে গিয়ে বই কেনা বা প্রিন্ট-ফটোকপির মতো প্রয়োজনীয় ব্যয় কমাতে হচ্ছে।”
শুধু খাদ্য নয়, পরিবহন ব্যয় ও বাসাভাড়াও শিক্ষার্থীদের ওপর বাড়তি চাপ সৃষ্টি করছে। অনেক শিক্ষার্থী জানান, বাসাভাড়া ও যাতায়াত খরচ বাড়ায় মাসিক ব্যয়ের বড় অংশ সেখানেই চলে যাচ্ছে। ফলে শিক্ষা–সংক্রান্ত অন্যান্য খরচ যেমন কোচিং, অনলাইন কোর্স বা প্রয়োজনীয় প্রযুক্তি ব্যবহারে বাধা সৃষ্টি হচ্ছে।
খরচের চাপ সামাল দিতে শিক্ষার্থীদের একটি বড় অংশ খণ্ডকালীন কাজে যুক্ত হচ্ছে। কেউ টিউশনি বাড়াচ্ছে, কেউ রাইড শেয়ারিং বা অনলাইন কাজের দিকে ঝুঁকছে। তবে এতে পড়াশোনার জন্য নির্ধারিত সময় কমে যাচ্ছে।
শিক্ষাবিদরা বলছেন, দীর্ঘদিন এভাবে পড়াশোনা ও কাজ একসঙ্গে চালাতে গেলে শিক্ষার মান ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
অর্থনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, বাজারে কার্যকর তদারকির অভাব, পরিবহন ব্যয় বৃদ্ধি এবং মধ্যস্বত্বভোগীদের প্রভাবের কারণেই নিত্যপণ্যের দাম নিয়ন্ত্রণে রাখা যাচ্ছে না। এর নেতিবাচক প্রভাব সমাজের সব স্তরে পড়লেও শিক্ষার্থীরা তুলনামূলকভাবে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছে, কারণ তাদের আয় সীমিত এবং ব্যয়ের বড় অংশই অনিবার্য।
এ পরিস্থিতিতে শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের পক্ষ থেকে দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার দাবি উঠেছে। তাদের মতে, শিক্ষার্থীদের জন্য ভর্তুকি মূল্যে খাদ্য সরবরাহ, সরকারি হলে খাবারের মান ও পরিমাণ নিশ্চিত করা, মেস ব্যবস্থাপনায় নজরদারি বাড়ানো এবং পরিবহন খরচ কমানোর উদ্যোগ নেওয়া জরুরি।
বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, শিক্ষার্থীরা জাতির ভবিষ্যৎ মানবসম্পদ। তাদের জীবনযাত্রার মান অবনতি হলে তা শুধু ব্যক্তিগত পর্যায়ে সীমাবদ্ধ থাকবে না, বরং দেশের সামগ্রিক শিক্ষা ও উন্নয়ন প্রক্রিয়ায় নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে। তাই নিত্যপণ্যের মূল্যবৃদ্ধি নিয়ন্ত্রণ এবং শিক্ষার্থীদের সুরক্ষায় কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণ এখন সময়ের দাবি।
লেখক: ফেরদৌস ইসলাম
শিক্ষার্থী,গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ
বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়,রংপুর।
ফেরদৌস ইসলাম 










