
|| মোহাম্মদ ইরফান ||দেশব্যাপী চলমান মূল্যস্ফীতির প্রভাব সবচেয়ে বেশি পড়ছে ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক ব্যবসায়ীদের ওপর। রংপুর শহর ও বিশ্ববিদ্যালয়ের আশপাশে ছোট ছোট ফুড কার্ট, ভ্যান ব্যবসায়ী, হোটেল-রেস্তোরাঁ, কাপড় ও কৃষিপণ্য বিক্রেতারা ক্রমেই আর্থিক সংকটে পড়ছেন। নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বেড়ে যাওয়ায় একদিকে যেমন ব্যবসা পরিচালনার খরচ বেড়েছে, অন্যদিকে ক্রেতার ক্রয়ক্ষমতা কমে যাওয়ায় বিক্রি হ্রাস পেয়েছে।
রংপুর শহরের চকবাজার, লালবাগ, মডার্ন মোড় ও ধাপ এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, প্রায় সব ধরনের ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরাই একই ধরনের সমস্যার কথা জানাচ্ছেন। চাল, ডাল, তেল, চিনি, মসলা, সবজি, মাংস, মাছ, গ্যাস ও বিদ্যুতের দাম বাড়ায় ব্যবসার দৈনন্দিন ব্যয় অনেক বেড়েছে। কিন্তু সেই অনুপাতে পণ্যের দাম বাড়াতে পারছেন না তারা। দাম বাড়াতে গেলে ক্রেতা হারানোর ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের তরুণ উদ্যোক্তা মো. অলিউল ইসলাম, যিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের পাশে একটি ছোট ফুড কার্ট পরিচালনা করেন, তিনি বলেন,
“নিত্যপণ্যের দাম বাড়ায় আমাদের মতো ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের খরচ অনেক বেড়ে গেছে। আগে যে পরিমাণ টাকা দিয়ে কাঁচামাল কিনতাম, এখন তার চেয়ে অনেক বেশি খরচ হচ্ছে। ফলে লাভ কমে যাচ্ছে, আবার দাম বাড়ালে ক্রেতাও কমে যায়। এতে ব্যবসা টিকিয়ে রাখা কঠিন হয়ে পড়েছে।”
লালবাগ এলাকার মুদি দোকানি আবদুল মালেক বলেন,
“পণ্যের দাম বাড়ার ফলে মানুষ আগের মতো নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্র কিনতে পারছে না। আগে যেখানে একজন ক্রেতা এক কেজি চাল নিতেন, এখন সেখানে আগের তুলনায় কম নিচ্ছেন। এতে লাভ হচ্ছে খুব সীমিত, যার ফলে দোকান ভাড়া থেকে শুরু করে অন্যান্য খরচ মেটানো দিনদিন কঠিন হয়ে যাচ্ছে।”
ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের বড় একটি সমস্যা হলো সীমিত পুঁজি। অনেকেই স্বল্প মূলধন নিয়ে ব্যবসা শুরু করেন এবং দৈনন্দিন আয় দিয়েই সংসার ও ব্যবসার খরচ চালান। মূল্যস্ফীতির ফলে যখন খরচ বাড়ে এবং বিক্রি কমে যায়, তখন তাদের হাতে নতুন করে বিনিয়োগ করার মতো টাকা থাকে না। কেউ কেউ বাধ্য হয়ে ঋণ নিচ্ছেন, আবার অনেকে দোকান বন্ধ করে বিকল্প কাজের সন্ধানে নামছেন।
অর্থনীতিবিদরা বলছেন, দীর্ঘমেয়াদি মূল্যস্ফীতি ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের ওপর তুলনামূলকভাবে বেশি চাপ সৃষ্টি করে। কারণ বড় ব্যবসার মতো তাদের কাছে বড় মূলধন, সঞ্চয় বা ঝুঁকি মোকাবিলার সক্ষমতা থাকে না। মূল্যস্ফীতি মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কমিয়ে দেয়, ফলে বাজারে চাহিদা সংকুচিত হয় এবং ক্ষুদ্র ব্যবসা সবচেয়ে আগে ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
একজন অর্থনীতি বিশ্লেষক বলেন,
“যখন পণ্যের দাম বাড়ে কিন্তু মানুষের আয় সেই অনুপাতে না বাড়ে, তখন তারা অপ্রয়োজনীয় ব্যয় কমিয়ে দেয়। এতে ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের বিক্রি কমে যায়। যদি এই পরিস্থিতি দীর্ঘস্থায়ী হয়, তবে কর্মসংস্থানেও নেতিবাচক প্রভাব পড়ে।”
এ বিষয়ে রংপুর ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের এক কর্মকর্তা জানান,
“আমরা নিয়মিত বাজার মনিটরিং করছি এবং অযৌক্তিক মূল্যবৃদ্ধি, মজুতদারি ও কারসাজির বিরুদ্ধে অভিযান পরিচালনা করছি। ব্যবসায়ী ও ভোক্তা উভয় পক্ষকেই সচেতন করা হচ্ছে, যাতে বাজারে স্থিতিশীলতা বজায় থাকে।”
তিনি আরও বলেন, ন্যায্য দামে পণ্য বিক্রি নিশ্চিত করতে ব্যবসায়ীদের আইনের আওতায় আনার পাশাপাশি সরবরাহ ব্যবস্থা স্বাভাবিক রাখার দিকেও গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা সরকারের কাছে স্বল্প সুদে ঋণ, কর ও লাইসেন্স ফিতে ছাড়, বিদ্যুৎ ও গ্যাস বিল কমানো এবং বাজারে নিত্যপণ্যের সরবরাহ স্বাভাবিক রাখার দাবি জানিয়েছেন। তারা মনে করেন, এসব সহায়তা পেলে তারা বর্তমান সংকট মোকাবিলা করে ব্যবসা টিকিয়ে রাখতে পারবেন।
সার্বিকভাবে দেখা যাচ্ছে, মূল্যস্ফীতি শুধু ভোক্তাদের জীবনযাত্রার ব্যয় বাড়াচ্ছে না, একই সঙ্গে ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের অস্তিত্বকেও হুমকির মুখে ফেলছে। এই শ্রেণির ব্যবসায়ীরা দেশের অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ অংশ এবং কর্মসংস্থানের বড় উৎস। তাই তাদের টিকিয়ে রাখতে দ্রুত ও কার্যকর নীতিগত সহায়তা নেওয়া জরুরি বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
লেখক: মোহাম্মদ ইরফান
শিক্ষার্থী, গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ
বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়, রংপুর
Reporter Name 










