Dhaka ০৬:২৫ অপরাহ্ন, শনিবার, ০৯ মে ২০২৬, ২৬ বৈশাখ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
শিরোনামঃ
রেট গ্যাপ ও ব্যাংকিং ঝামেলায় মিরসরাইয়ে হুন্ডিমুখী প্রবাসী পরিবার শীতে সবজির জোগান থাকলেও কমছে না দাম রংপুরে ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের ওপর মূল্যস্ফীতির প্রভাব রংপুরে এলপিজি সংকট, সরকার নির্ধারিত দামের বাইরে বিক্রি হচ্ছে সিলিন্ডার খরচের চাপে ভাঙছে ক্ষুদ্র ব্যবসা ডলার সংকটে স্থবির আমদানি-রপ্তানি, বাড়ছে উৎপাদন ব্যয় ও মুল্যস্ফীতির চাপ নিত্যপণ্যের মূল্যবৃদ্ধিতে বিপর্যস্ত শিক্ষার্থীদের জীবন, বাড়ছে অনিশ্চয়তা ‘দেরি হওয়ার আগেই চুক্তি করো’, কিউবাকে ট্রাম্পের হুঁশিয়ারি ইরানে বিক্ষোভ ঘিরে ব্যাপক সহিংসতা: নিহত ১০৯ নিরাপত্তা সদস্য নির্বাচন অবাধ ও উৎসবমুখর হবে: ইইউ প্রতিনিধিদলকে প্রধান উপদেষ্টা
বিজ্ঞাপন:
আপনাদের ভালোবাসা ও আস্থার সাথে এগিয়ে চলছে দৈনিক বঙ্গচিত্র। দেশের প্রতিটি প্রান্তের খবর, রাজনীতি, অর্থনীতি, সমাজ, সংস্কৃতি, শিক্ষা, খেলাধুলা ও বিনোদনসহ সকল গুরুত্বপূর্ণ সংবাদ আমরা আপনাদের কাছে পৌঁছে দিতে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ।

রেট গ্যাপ ও ব্যাংকিং ঝামেলায় মিরসরাইয়ে হুন্ডিমুখী প্রবাসী পরিবার

||সাব্বির হাসান|| চট্টগ্রামের মিরসরাই উপজেলার প্রায় প্রতিটি পরিবারে একজন না একজন প্রবাসী। স্থানীয় পরিসংখ্যান দপ্তরের জরিপ অনুযায়ী, উপজেলায় প্রবাসীর সংখ্যা প্রায় ৫০ হাজার হতে পারে – যদিও চূড়ান্ত হিসাব পেতে আরও সময় লাগবে। ২০২২ সালের আদমশুমারি অনুযায়ী, ১৬ ইউনিয়ন ও ২ পৌরসভা নিয়ে গঠিত মিরসরাইয়ের জনসংখ্যা ৪ লাখ ৭১ হাজার ৭৫২।

তবে প্রবাসী অধ্যুষিত এই এলাকায় প্রত্যাশার তুলনায় ব্যাংকিং চ্যানেলে রেমিট্যান্স কম – অভিযোগগুলো ঘুরছে একই জায়গায়: ব্যাংকে গিয়ে কারেন্সি জমা, দেশে টাকা তুলতে ৪-৫ দিন সময়, আবার নির্ধারিত ব্যাংকে গিয়ে সিরিয়াল-ঝামেলা। বিপরীতে হুন্ডিতে টাকা ‘দ্রুত’ পৌঁছায় এবং অনেক সময় বাড়িতে পৌঁছে দেওয়ার ব্যবস্থাও থাকে।

রেট গ্যাপই বড় টান

মিরসরাইয়ে হুন্ডির জনপ্রিয় হওয়ার আরেকটি বড় কারণ – বিনিময় হারের পার্থক্য। প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, সংযুক্ত আরব আমিরাত থেকে ব্যাংকে পাঠালে এক দিরহামে পাওয়া যায় ২৯.৯৩ টাকা, হুন্ডিতে ৩১.৬০ টাকা। ফলে ১ হাজার দিরহামে ব্যাংকে ২৯,৯৩০ টাকা মিললেও হুন্ডিতে পাওয়া যায় ৩১,৬০০ টাকা – অর্থাৎ প্রায় ১,৬৭০ টাকা বেশি। এই ‘রেট গ্যাপ’ অনেক পরিবারকে হুন্ডির দিকে ঠেলে দিচ্ছে।

“ফোন দিলেই আধঘণ্টায় টাকা” – কীভাবে চলে নেটওয়ার্ক

স্থানীয় প্রতিবেদনে দেখা গেছে, প্রবাসে থাকা এজেন্টকে টাকা দিয়ে দেশে স্বজনকে ফোনে জানানো হয়। এরপর যাচাই করে অল্প সময়ের মধ্যেই অপরিচিত নম্বর থেকে কল আসে, এবং কিছুক্ষণের মধ্যে নির্ধারিত ঠিকানায় নগদ পৌঁছে যায়। এই দ্রুততা ও ঘরে পৌঁছে দেওয়ার সুবিধাই অনেককে ব্যাংক এড়িয়ে চলতে উৎসাহিত করছে।

একইসঙ্গে এলাকায় হুন্ডির “সিন্ডিকেট” গড়ে ওঠার কথাও উঠে এসেছে – যাদের নিয়ন্ত্রণ নাকি চট্টগ্রাম শহরের কিছু বাণিজ্যিক এলাকার মাধ্যমে হয় এবং মিরসরাইয়ের বিভিন্ন বাজার-কেন্দ্রিক অঞ্চলে তাদের কার্যক্রম ছড়িয়ে আছে।

জাতীয় চিত্রেও একই প্রবণতা – “মোবাইলে পাঠালেও তা আদতে হুন্ডি”

মিরসরাইয়ের বাস্তবতার সঙ্গে জাতীয় চিত্রও মিলে যায়। দৈনিক ইনকিলাবের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিদেশে অনেক জায়গায় দোকানে দোকানে বাংলাদেশের মোবাইল ব্যাংকিং সেবার মতো করে টাকা নেওয়া হয় এবং কয়েক মিনিটের মধ্যে দেশে স্বজনের মোবাইলে পৌঁছে যায় – বাইরে থেকে ‘মোবাইল ব্যাংকিং’ মনে হলেও বাস্তবে তা হুন্ডির অংশ। একই প্রতিবেদনে বৈধ পথে বাড়তি টাকা পাঠাতে গিয়ে নানা জটিলতা ও ঝুঁকির কথাও এসেছে।

অর্থনীতিতে চাপ – রিজার্ভ, স্বচ্ছতা ও কালোবাজারি

অর্থনীতিবিদদের মতে, বৈধ চ্যানেলের বাইরে লেনদেনে রাষ্ট্র বৈদেশিক মুদ্রার আনুষ্ঠানিক প্রবাহ থেকে বঞ্চিত হয়, আর কালোবাজারি ও অবৈধ নেটওয়ার্ক লাভবান হয় – ফলে ডলার সংকটসহ সামগ্রিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতায় চাপ বাড়তে পারে।

প্রণোদনা আছে, কিন্তু মাঠপর্যায়ে আস্থা কম

প্রবাসীদের বৈধ পথে উৎসাহিত করতে সরকার রেমিট্যান্সে নগদ প্রণোদনা চালু রেখেছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের সার্কুলার উদ্ধৃত করে দ্য ডেইলি স্টার জানিয়েছে – নির্দিষ্ট ক্ষেত্রে রেমিট্যান্সে ২.৫ শতাংশ প্রণোদনা দেওয়া হয়।
বণিক বার্তাও জানিয়েছে, ২০২২ সাল থেকে প্রণোদনা ২ শতাংশ থেকে বেড়ে ২.৫ শতাংশ করা হয়।
এ ছাড়া স্থানীয় ব্যাংক কর্মকর্তাদের উদ্ধৃতি অনুযায়ী, প্রবাসী আয়ে নির্দিষ্ট অংকে প্রণোদনার সুবিধা থাকলেও ব্যাংকিং প্রক্রিয়া “ঝামেলাপূর্ণ” মনে হওয়ায় অনেকে ফেরত আসছেন না।

প্রশাসনের অবস্থান

স্থানীয় পুলিশ প্রশাসনের বক্তব্য – হুন্ডি ব্যবসায়ীরা প্রকাশ্যে আসেন না, আর এখন পর্যন্ত নির্দিষ্ট অভিযোগ না থাকায় তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া কঠিন। অভিযোগ পেলে তদন্ত সাপেক্ষে আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার কথাও বলা হয়েছে।

Popular Post

রেট গ্যাপ ও ব্যাংকিং ঝামেলায় মিরসরাইয়ে হুন্ডিমুখী প্রবাসী পরিবার

রেট গ্যাপ ও ব্যাংকিং ঝামেলায় মিরসরাইয়ে হুন্ডিমুখী প্রবাসী পরিবার

Update Time : ০৩:০৯:৫০ অপরাহ্ন, বুধবার, ২১ জানুয়ারী ২০২৬

||সাব্বির হাসান|| চট্টগ্রামের মিরসরাই উপজেলার প্রায় প্রতিটি পরিবারে একজন না একজন প্রবাসী। স্থানীয় পরিসংখ্যান দপ্তরের জরিপ অনুযায়ী, উপজেলায় প্রবাসীর সংখ্যা প্রায় ৫০ হাজার হতে পারে – যদিও চূড়ান্ত হিসাব পেতে আরও সময় লাগবে। ২০২২ সালের আদমশুমারি অনুযায়ী, ১৬ ইউনিয়ন ও ২ পৌরসভা নিয়ে গঠিত মিরসরাইয়ের জনসংখ্যা ৪ লাখ ৭১ হাজার ৭৫২।

তবে প্রবাসী অধ্যুষিত এই এলাকায় প্রত্যাশার তুলনায় ব্যাংকিং চ্যানেলে রেমিট্যান্স কম – অভিযোগগুলো ঘুরছে একই জায়গায়: ব্যাংকে গিয়ে কারেন্সি জমা, দেশে টাকা তুলতে ৪-৫ দিন সময়, আবার নির্ধারিত ব্যাংকে গিয়ে সিরিয়াল-ঝামেলা। বিপরীতে হুন্ডিতে টাকা ‘দ্রুত’ পৌঁছায় এবং অনেক সময় বাড়িতে পৌঁছে দেওয়ার ব্যবস্থাও থাকে।

রেট গ্যাপই বড় টান

মিরসরাইয়ে হুন্ডির জনপ্রিয় হওয়ার আরেকটি বড় কারণ – বিনিময় হারের পার্থক্য। প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, সংযুক্ত আরব আমিরাত থেকে ব্যাংকে পাঠালে এক দিরহামে পাওয়া যায় ২৯.৯৩ টাকা, হুন্ডিতে ৩১.৬০ টাকা। ফলে ১ হাজার দিরহামে ব্যাংকে ২৯,৯৩০ টাকা মিললেও হুন্ডিতে পাওয়া যায় ৩১,৬০০ টাকা – অর্থাৎ প্রায় ১,৬৭০ টাকা বেশি। এই ‘রেট গ্যাপ’ অনেক পরিবারকে হুন্ডির দিকে ঠেলে দিচ্ছে।

“ফোন দিলেই আধঘণ্টায় টাকা” – কীভাবে চলে নেটওয়ার্ক

স্থানীয় প্রতিবেদনে দেখা গেছে, প্রবাসে থাকা এজেন্টকে টাকা দিয়ে দেশে স্বজনকে ফোনে জানানো হয়। এরপর যাচাই করে অল্প সময়ের মধ্যেই অপরিচিত নম্বর থেকে কল আসে, এবং কিছুক্ষণের মধ্যে নির্ধারিত ঠিকানায় নগদ পৌঁছে যায়। এই দ্রুততা ও ঘরে পৌঁছে দেওয়ার সুবিধাই অনেককে ব্যাংক এড়িয়ে চলতে উৎসাহিত করছে।

একইসঙ্গে এলাকায় হুন্ডির “সিন্ডিকেট” গড়ে ওঠার কথাও উঠে এসেছে – যাদের নিয়ন্ত্রণ নাকি চট্টগ্রাম শহরের কিছু বাণিজ্যিক এলাকার মাধ্যমে হয় এবং মিরসরাইয়ের বিভিন্ন বাজার-কেন্দ্রিক অঞ্চলে তাদের কার্যক্রম ছড়িয়ে আছে।

জাতীয় চিত্রেও একই প্রবণতা – “মোবাইলে পাঠালেও তা আদতে হুন্ডি”

মিরসরাইয়ের বাস্তবতার সঙ্গে জাতীয় চিত্রও মিলে যায়। দৈনিক ইনকিলাবের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিদেশে অনেক জায়গায় দোকানে দোকানে বাংলাদেশের মোবাইল ব্যাংকিং সেবার মতো করে টাকা নেওয়া হয় এবং কয়েক মিনিটের মধ্যে দেশে স্বজনের মোবাইলে পৌঁছে যায় – বাইরে থেকে ‘মোবাইল ব্যাংকিং’ মনে হলেও বাস্তবে তা হুন্ডির অংশ। একই প্রতিবেদনে বৈধ পথে বাড়তি টাকা পাঠাতে গিয়ে নানা জটিলতা ও ঝুঁকির কথাও এসেছে।

অর্থনীতিতে চাপ – রিজার্ভ, স্বচ্ছতা ও কালোবাজারি

অর্থনীতিবিদদের মতে, বৈধ চ্যানেলের বাইরে লেনদেনে রাষ্ট্র বৈদেশিক মুদ্রার আনুষ্ঠানিক প্রবাহ থেকে বঞ্চিত হয়, আর কালোবাজারি ও অবৈধ নেটওয়ার্ক লাভবান হয় – ফলে ডলার সংকটসহ সামগ্রিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতায় চাপ বাড়তে পারে।

প্রণোদনা আছে, কিন্তু মাঠপর্যায়ে আস্থা কম

প্রবাসীদের বৈধ পথে উৎসাহিত করতে সরকার রেমিট্যান্সে নগদ প্রণোদনা চালু রেখেছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের সার্কুলার উদ্ধৃত করে দ্য ডেইলি স্টার জানিয়েছে – নির্দিষ্ট ক্ষেত্রে রেমিট্যান্সে ২.৫ শতাংশ প্রণোদনা দেওয়া হয়।
বণিক বার্তাও জানিয়েছে, ২০২২ সাল থেকে প্রণোদনা ২ শতাংশ থেকে বেড়ে ২.৫ শতাংশ করা হয়।
এ ছাড়া স্থানীয় ব্যাংক কর্মকর্তাদের উদ্ধৃতি অনুযায়ী, প্রবাসী আয়ে নির্দিষ্ট অংকে প্রণোদনার সুবিধা থাকলেও ব্যাংকিং প্রক্রিয়া “ঝামেলাপূর্ণ” মনে হওয়ায় অনেকে ফেরত আসছেন না।

প্রশাসনের অবস্থান

স্থানীয় পুলিশ প্রশাসনের বক্তব্য – হুন্ডি ব্যবসায়ীরা প্রকাশ্যে আসেন না, আর এখন পর্যন্ত নির্দিষ্ট অভিযোগ না থাকায় তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া কঠিন। অভিযোগ পেলে তদন্ত সাপেক্ষে আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার কথাও বলা হয়েছে।