
মদনে খুনের মীমাংসার টাকা না দেওয়ায় সংঘর্ষ: নারীসহ আহত অর্ধশতাধিক, ভাঙচুর-লুটপাট
মোঃ রাসেল আহমেদ, নেত্রকোনা প্রতিনিধি
নেত্রকোনার মদন উপজেলায় খুনের ঘটনার মীমাংসায় নির্ধারিত জরিমানার টাকা না দেওয়াকে কেন্দ্র করে দুই পক্ষের সংঘর্ষে অন্তত অর্ধশতাধিক লোক আহত হয়েছে। শুক্রবার (১২ সেপ্টেম্বর) বিকেলে উপজেলার নায়েকপুর ইউনিয়নের আলমশ্রী গ্রামে এ সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। সংঘর্ষে নারীসহ অন্তত ৫০ জন আহত হন। গুরুতর আহত ৮ জনকে ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে।
প্রত্যক্ষদর্শী ও এলাকাবাসীর সূত্রে জানা যায়, প্রায় সাত বছর আগে আলমশ্রী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সামনে পাঁচ গোত্রের মধ্যে সংঘর্ষে জিলদার মিয়ার ছেলে বিভেক নিহত হন। এ ঘটনায় নিহতের পরিবার প্রতিপক্ষের ৭৮ জনকে আসামি করে একটি হত্যা মামলা দায়ের করেন, যা এখনো আদালতে সাক্ষ্যগ্রহণ পর্যায়ে রয়েছে।
সালিশে জরিমানা নির্ধারণ, মতবিরোধে রূপ নেয় সংঘর্ষে।
ঘটনার দীর্ঘসূত্রিতা নিরসনে দেড় মাস আগে স্থানীয় মাতব্বরদের উদ্যোগে এক সালিশি বৈঠকে বিবেক হত্যা মামলার আপোষ-মীমাংসা হয়। বৈঠকে আসামিপক্ষের পাঁচ গোত্রকে মিলিয়ে নিহতের পরিবারকে ১০ লক্ষ টাকা ক্ষতিপূরণ দেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়।
তবে ওই পাঁচ গোত্রের একজন, ইউপি সদস্য ফারুক মিয়া টাকা পরিশোধে আগ্রহ দেখালেও অপর গোত্রপ্রধান বিল্লাল মিয়া তা মানতে অস্বীকৃতি জানান। সালিশি বৈঠকে ফারুক মিয়া দাবি করেন, সব গোত্রের টাকা তার হাতে দিতে হবে, যাতে তিনি নিহতের পরিবারকে পরিশোধ করেন। কিন্তু বিল্লাল মিয়া ও তার সমর্থকরা এতে আপত্তি জানান। তারা জানান,
> “আমরা সবাই সরাসরি নিহত পরিবারের হাতে টাকা দিতে চাই, উপজেলা ও স্থানীয় নেতৃবৃন্দের উপস্থিতিতে, স্বচ্ছভাবে। কিন্তু ফারুক মিয়া তা মানতে রাজি হননি।”
এই বিরোধের জেরে শুক্রবার বিকেলে উভয় পক্ষের মধ্যে সংঘর্ষ বাধে। সংঘর্ষে দেশীয় অস্ত্রের ব্যবহার হয় এবং বিল্লাল মিয়ার পক্ষের অন্তত ২৫টি বাড়িঘরে ভাঙচুর ও লুটপাট চালানো হয় বলে অভিযোগ ওঠে।
গুরুতর আহতদের মধ্যে রয়েছেন:
- শহীদ (৪০), পিতা: লতিফ মিয়া
সালেহীন (২৫), পিতা: কাসেম আলী
অলি (৩০), পিতা: হাসু মিয়া
আছিয়া আক্তার (৬০), স্ত্রী কাছম আলী
কাসেম (৩২), পিতা: মারফত আলী
তারু (৬০), পিতা: মইজুদ্দিন
সম্রাট (৩০), পিতা: আব্দুল
অন্য আহতরা মদন উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স ও স্থানীয়ভাবে প্রাথমিক চিকিৎসা নিয়েছেন।
পক্ষদ্বয়ের বক্তব্য
ইউপি সদস্য ফারুক মিয়া বলেন,
> “বিবেক হত্যার মামলায় আমিই প্রধান আসামি। স্থানীয়ভাবে আপোষ-মীমাংসা করে দশ লক্ষ টাকা ক্ষতিপূরণের সিদ্ধান্ত হয়। কিন্তু বিল্লাল মিয়া ও তার গোত্র টাকা দিতে রাজি না হওয়ায় এই সমস্যা তৈরি হয়েছে। আমি সংঘর্ষের সময় বাড়িতে ছিলাম না। পরে শুনেছি সংঘর্ষ হয়েছে।”
অপরদিকে, বিল্লাল মিয়া বলেন,
> “আমরা টাকার অংশ জমা রেখেছিলাম নিহতের পরিবারকে দেওয়ার জন্য। কিন্তু প্রধান আসামি ফারুক মিয়াকে না দেওয়ায় আমাদের ওপর হামলা হয়েছে। এতে আমাদের ২৫টি বাড়িতে ভাঙচুর ও লুটপাট করা হয়।”
ভুক্তভোগীদের অভিযোগ,
> “ফারুক মিয়ার কথাতেই আমাদের বাড়িঘরে হামলা চালানো হয়েছে। ফারুক মিয়ার হাতে কেন টাকা দেওয়া হলো না—এই কারণেই আমাদের ঘরবাড়ি ভেঙে লুটপাট চালানো হয়। আমাদের পরিবারের পুরুষ সদস্যরা বলেছিল, আমরা সরাসরি নিহতের পরিবারের কাছে টাকা দিব, থানা ও উপজেলা পর্যায়ের নেতৃবৃন্দকে নিয়ে যাচাই-বাছাই করে দিব। কিন্তু এই প্রস্তাব ফারুক মিয়া মানতে রাজি হননি।”
সালিশি বৈঠকে উপস্থিত এক মাতব্বর নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান,
> “দুই পক্ষের সম্মতিতে ১০ লক্ষ টাকায় মীমাংসা হয়েছিল। কিন্তু এখন একপক্ষ পিছিয়ে যাওয়ায় পরিস্থিতির অবনতি ঘটেছে।”
প্রশাসনের অবস্থান-
মদন থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোঃ শামসুল আলম শাহ্ বলেন,
> “আলমশ্রী গ্রামে সংঘর্ষের খবর পেয়েই পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে। বর্তমানে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। এখনো পর্যন্ত কোনো পক্ষ লিখিত অভিযোগ দেয়নি। অভিযোগ পেলে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
Reporter Name 











