
|| বিএন আহাম্মেদ|| নির্বাচনের মৌসুম এলেই বাংলাদেশের রাজনীতিতে যেসব শব্দ ঘনঘন উচ্চারিত হতে থাকে নেগোসিয়েশন, জোট গঠন, লোবিং কিংবা সমঝোতা এরমধ্যে অন্যতম। পারস্পরিক আলাপচারিতা, সমঝোতা সুষ্ঠু, শৃঙ্খল রাজনীতির জন্য প্রয়োজন বটে। তবে নেগোসিয়েশন যখন হয় সংসদীয় আসন ভাগাভাগির তখন রাজনৈতিক দলগুলো গৃহপালিত রাজনৈতিক দলে পরিণত হয়।
দলগুলো যখন রাজনৈতিক স্বীকৃতি কিংবা আসনের মোহে আপস করে, তখন তাদের রাজনীতির নৈতিক ভিত্তি দুর্বল হয়ে পড়ে, জনগণ তাদের রাজনৈতিক বিকল্প হারায়। বিরোধী দল যেখানে সরকারের প্রতিটি পদক্ষেপকে বিশ্লেষণ ও পর্যালোচনার মাধ্যমে জনস্বার্থ রক্ষায় ভূমিকা রাখে, সেখানে গৃহপালিত বিরোধী দল হয়ে ওঠে ‘প্রহসনের সংসদ’ তৈরির হাতিয়ার। এই প্রক্রিয়া দেশে কার্যত এক ধরনের ফ্যাসিবাদী শাসনব্যবস্থার ভিত্তি গড়ে তোলে, যেখানে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা,জনগণের কন্ঠস্বর, রাজনৈতিক ভারসাম্য সবই হারিয়ে যেতে বসে।
নেগোসিয়েশন যদি সত্যিকার অর্থে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ও জবাবদিহিতামূলক সংসদে লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড বাস্তবায়নের লক্ষ্যে হতো, তাহলে সেটিকে ইতিবাচক বলা যেত। কিন্তু বাস্তবে এসব সমঝোতা বড় দলের কর্তৃত্ব নিশ্চিত করতে এবং বিরোধী কণ্ঠ রোধ করতে ব্যবহৃত হয়। এতে সংসদ কার্যত একমুখী হয়ে যায়, সরকার নিজ স্বার্থ হাসিলের লক্ষে নির্বিঘ্নে যে কোনো অন্যায্য সিদ্ধান্ত নিতে পারে। এরশাদের সামরিক শাসনের সময় আওয়ামী লীগ এবং জাতীয় পার্টির মধ্যে নেগোসিয়েশন এর মাধ্যমে ১৯৮৬ সালের সংসদ নির্বাচনে অংশগ্রহণের সিদ্ধান্ত হয়। অন্যদিকে বিএনপি নির্বাচন বর্জন করে। এর মাধ্যমে বাংলাদেশের জনগণের কাছে আওয়ামী লীগের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হয়, আস্থা কমে যায় এবং বিএনপির ভোট ব্যাংক বৃদ্ধি পায়। ফলাফল স্বরূপ পঞ্চম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপি সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে জয়লাভ করে।
২০০৮ সালের পর আওয়ামী লীগ আমলে জাতীয় পার্টির ভূমিকা ছিল “সরকারপন্থী বিরোধী দল” হিসেবে। সংসদে কিছু আসন, কিছুটা রাজনৈতিক স্বীকৃতির লোভে আওয়ামী লীগের সঙ্গে নেগোসিয়েশন এর মাধ্যমে জাতীয় পার্টি পরিণত হয়েছিলো একটি গৃহপালিত দলে। আর এভাবেই দেশে একরকম “প্রহসনের সংসদ” তৈরি হয়েছিলো যেখানে সরকার নিজেই বিরোধী দলকে নিয়ন্ত্রণ করছিল।
বাংলাদেশের জন্মলগ্ন থেকে একটি বড় রাজনৈতিক সংকট হলো শক্তিশালী বিরোধীদলের অভাব। বিএনপি ও আওয়ামী লীগ দুটি দল একে অপরের বিপক্ষে শক্তিশালী অবস্থান ধরে রাখলেও আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর বিএনপিকে দমন-পীড়নের মাধ্যমে পুরোপুরি কোনঠাসা করে ফেলে। জুলাই অভ্যুত্থানের পর বাংলাদেশের রাজনীতিতে আওয়ামী লীগের খুব তাড়াতাড়ি ফিরে আসা প্রায় অনিশ্চিত। এর মাধ্যমে আবারও একটি রাজনৈতিক শূন্যতার তৈরি হয়েছে। এই শূন্যতা ঘোচাতে এনসিপি, আপ বাংলাদেশ সহ আরো কিছু রাজনৈতিক দলের উত্থান ঘটেছে।
জুলাই অভ্যুত্থানের পর বিপ্লবের শক্তি হিসেবে আত্মপ্রকাশ করতে চাওয়া এনসিপির রাজনৈতিক অবস্থান এবং কৌশল নিয়ে বিশ্লেষণ করতে গেলে এক মৌলিক প্রশ্ন উঠে আসে—এই দল কি সত্যিই বাংলাদেশের রাজনীতির নতুন সম্ভাবনা হয়ে উঠতে পারবে?
বিএনপি বিশাল সংখ্যাগরিষ্টতা ও জনসমর্থন নিয়ে ভোটের মাঠে এগিয়ে থাকবে এটা পূর্ব অনুমানযোগ্য। তাই এনসিপি, আপ বালাদেশের মতো নতুন দলের জন্য রাজনীতির মাঠে যায়গা করে নিতে বিএনপির সঙ্গে আসন ভাগাভাগিতে যাওয়ার একটি বড় সম্ভাবনা থেকে যায়। এনসিপি একটি উদীয়মান রাজনৈতিক দল। তবে বিপ্লবের শক্তি হিসেবে যে পরিমান জনসমর্থন নিয়ে এনসিপি যাত্রা শুরু করেছিলো পর্যাপ্ত রাজনৈতিক প্রজ্ঞা, জনবল ও শক্তিশালী দলীয় কাঠামো না থাকায় তা এখন শূণ্যের কোঠায়। এই পরিস্থিতিতে ভবিষ্যতে রাজনীতিতে প্রাসঙ্গিক থাকার জন্য এনসিপি কোনো প্রকার নেগোসিয়েশনে যাবে কি-না তা নিয়ে ভাবতে হতে পারে তাদের। যদিও এনসিপি বরাবরই বলে আসছে তারা কোনো নেগোসিয়েশনে যাবে না।
বর্তমান প্রেক্ষাপটে, এনসিপিও সংসদে কিছু আসন বরাদ্দ পেতে নেগোসিয়েশন করবে কি না তা বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে। এই নেগোসিয়েশন দলের জন্য তাৎক্ষণিক কিছু লাভ এনে দিলেও আদর্শিক এবং কৌশলগতভাবে এটি এক আত্মঘাতী অবস্থান হবে।
নেগোসিয়েশনে অংশগ্রহণের মাধ্যমে এনসিপি কিছু স্বল্পমেয়াদী সুবিধা পেতে পারে যেমন কিছু সংসদীয় আসন, মিডিয়ায় কিছুটা গুরুত্ব, এবং সরকারঘেঁষা অবস্থানে কিছু নীতিগত সুবিধা। এই প্রক্রিয়ায় সংসদে নিজেদের প্রতিনিধি নিশ্চিতের মাধ্যমে ধীরে ধীরে যেমন দলীয় কাঠামো আরো মজবুত করার সুযোগ পাবে একই ভাবে জনগণের হয়ে কথা বলার জন্য নিজেদের প্রতিনিধি নিশ্চিত করতে পারবে তারা। পাশাপাশি সংসদের যেকোনো সিদ্ধান্তে নীতিগত অবস্থান উপস্থাপনের সুযোগও পাবে তারা।
কিন্তু এই লাভের পেছনে যে রাজনৈতিক মূল্য দিতে হবে, তা অনেক বেশি। প্রথমত, তারা আদর্শিক অবস্থান হারাবে এবং জাতীয় পার্টির ন্যায় গৃহপালিত বিরোধী দল’ এ পরিণিত হওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হবে। দ্বিতীয়ত, তরুণ প্রজন্ম ও রাজনৈতিকভাবে সচেতন জনগণ, যারা বিকল্প রাজনৈতিক চর্চার স্বপ্ন দেখে, তারা এদের থেকে মুখ ফিরিয়ে নেবে। জুলাইয়ের আকাঙ্খা লালন করা বাংলাদেশের যুব সমাজ অভ্যুত্থানের পর থেকেই আস্থা রেখেছে এনসিপির উপর। এই আস্থা হারানোর বড় কারণ হবে সংসদে কিছু আসনের মোহে আপোষ করা।
তৃতীয়ত, দলের অভ্যন্তরে আদর্শিক বিভাজন তৈরি হবে। একটি অংশ আপসে রাজি হলেও, অন্য অংশ হয়তো আপসবিরোধী অবস্থান নেবে। দলের কিছু নেতা সংসদে থাকবে এবং বাকিরা সংসদের বাইরে এই নীতি দলের ঐক্যে ফাটল ধরাবে। এতে দলের সংহতি নষ্ট হবে এবং ভবিষ্যৎ নেতৃত্ব সংকটে পড়বে। এ ধরনের বিভাজন কেবল দলীয় দৃষ্টিকোণ থেকেই নয়, বরং জাতীয় রাজনীতির দিক থেকেও ক্ষতিকর, কারণ এটি আরও একটি সম্ভাব্য বিকল্প শক্তিকে নিঃশেষ করে দিতে পারে।
এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের জন্য এনসিপির সবচেয়ে জরুরি কাজ হলো রাজনৈতিক আদর্শে দৃঢ় থাকা। শুধু আসনের জন্য তারা সংসদে যেতে চায় না, বরং জনগণের প্রতিনিধি হয়ে সংসদে জবাবদিহিতার চর্চা শুরু করতে চায় এই বার্তা স্পষ্টভাবে দিতে হবে। এ জন্য চাই জনসম্পৃক্ততা, শক্তিশালী সাংগঠনিক কাঠামো এবং মজবুত আদর্শ ভিত্তিক রাজনৈতিক-সংস্কৃতির চর্চা।
গৃহপালিত বিরোধী দল তৈরি মানেই সংসদে মতপার্থক্য ও নীতিগত বিতর্কের জায়গা সংকুচিত হয়ে পড়া। এর ফলে ক্ষমতাসীন দলের জবাবদিহিতা কমে যায়, নীতিনির্ধারণে একপাক্ষিকতা তৈরি হয়, জনগণের আস্থার অভাব তৈরি হয়। বাংলাদেশে গণতন্ত্রের টেকসই ভবিষ্যতের জন্য একটি কার্যকর, আদর্শিক এবং স্বাধীন বিরোধী দলের অভাব খুব শীঘ্রই পরিলক্ষিত হবে। এনসিপির রাজনীতি কোন পথে যাবে, তা শুধু দলের নয়, জাতীয় রাজনীতির দিক নির্ধারণেও প্রভাব ফেলবে।
• বখতিয়ার নাসিফ আহাম্মেদ, শিক্ষার্থী, গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা, বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়, রংপুর।
#বিএন
বিএন আহাম্মেদ 











